সামাজিক নির্বাচন এবং সমৃদ্ধি



মানুষ সবসময়ই চেয়েছে দলবদ্ধ হয়ে বাস করতে এবং তাদের ব্যক্তিজীবন নানাভাবে  দলীয় সিদ্ধান্তের উপরে নির্ভরশীল। কিন্তু, দলীয় সিদ্ধান্তের বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা আছে, বিশেষ করে দলের সদস্যদের নানাবিধ স্বার্থ ও মনোভাব বিবেচনা করলে। তাহলে কীভাবে দলগত সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে?

একজন স্বৈরশাসক চান অন্যের মতের তোয়াক্কা না করেই মানুষের জীবনের প্রতিটি দিক নিজের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করতে। কিন্তু এই পর্যায়ের ক্ষমতা সহজে অর্জন করা যায় না। তদুপরি, স্বৈরশাসন যেকোনো সমাজকে পরিচালনা করার জন্য একটি নিন্দনীয় মাধ্যম বলে বিবেচিত হয়। একারণে, নৈতিক এবং বাস্তবিক উভয় কারণেই সমাজবিজ্ঞানীরা দীর্ঘসময় ধরে অনুসন্ধান করেছেন কোন সমাজ যদি পুরোপুরি গণতান্ত্রিক নাও হয়, তবুও কীভাবে সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় সকল সদস্যের মতের কোন না কোনভাবে প্রতিফলন ঘটানো  যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় খ্রিষ্টপূর্ব ৪ অব্দে প্রাচীন গ্রিসে এরিস্টটল এবং ভারতে কৌটিল্য সামাজিক নির্বাচনের নানাদিক (যেমনঃ রাজনীতি ও অর্থনীতি )  তাদের কালজয়ী বইগুলোতে বর্ণনা করেছেন। ( কৌটিল্যের বইয়ের সংস্কৃত নাম হল অর্থশাস্ত্র, যার অর্থঃ বস্তুজাগতিক উন্নয়নের বিজ্ঞান)

একটি বিধিবদ্ধ বিষয় হিসেবে সামাজিক নির্বাচন আবির্ভূত হয় মূলত অষ্টদশ শতকের শেষ দিকে, ফরাসী গণিতবিদ জি সি বোর্দা এবং মার্কো ডি কন্ডোর্সের হাত ধরে। তৎকালীন জ্ঞান বিজ্ঞান ইউরোপীয় নবজাগরণ তথা রেনেসাঁ দ্বারা তীব্রভাবে অনুপ্রাণিত হয়। এই নবজাগরণের মূল উদ্দেশ্য ছিল নতুন একটি সামাজিক কাঠামো নির্মাণ করা এবং এমন একটি সমাজ ব্যবস্থা তৈরি করা যেখানে সব মানুষের মতেরই সমান গুরুত্ব থাকবে।

কিন্তু বোর্দা-কন্ডোর্সে এবং পরবর্তী সময়ে আরও অনেকের তাত্ত্বিক গবেষণায় এই বিষয়ে হতাশাজনক ফলাফল পাওয়া গেছে। উদাহরণ হিসেবে কোন্ডর্সের উপস্থাপিত ভোটিং প্যারাডক্স তত্ত্বের কথা বলা যায়, যেখানে দেখা গেছে নির্বাচনের ক্ষেত্রে মেজরিটি রুল এমন একটি অবস্থায় পৌঁছাতে পারে যেখানে প্রত্যেক সিদ্ধান্তই অন্য কোন না কোন সিদ্ধান্ত দ্বারা ভোটে পরাজিত হয়। এর ফলে একটি সিদ্ধান্ত কোনভাবেই অন্যসব সিদ্ধান্তের উপরে অবস্থান করতে পারে না। সামাজিক নির্বাচন তত্ত্ব আজকের আধুনিক ও পর্যায়ক্রমিক ভিত্তি অর্জন করার পিছনে সবচেয়ে বড় অবদান কেনেথ জে অ্যারো এবং ১৯৫০ সালে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পন্ন করা তাঁর পিএইচডির গবেষণাপত্র এর। তাঁর এই গবেষণার মাধ্যমেই পৃথিবী পরিচিত হয় বিখ্যাত “অসম্ভাব্যতা তত্ত্বের” সাথে - যা একটি অসাধারণ বিশ্লেষণাত্মক ও অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার ফসল।    

অ্যারো’র অসম্ভাব্যতা তত্ত্ব থেকে দেখা যায়, কোন প্রক্রিয়াতেই সমাজের সকল সদস্যের মতামতের উপরে ভিত্তি করে নেয়া সামাজিক সিদ্ধান্ত এবং যৌক্তিকতার মানদণ্ডকে সহবস্থানে রাখা যায়না১৯৫১ সালে তাঁর এই গবেষণাপত্রের উপরে ভিত্তি করে “সোশ্যাল চয়েজ এবং ইন্ডিভিজ্যুয়াল ভ্যালুস” প্রকাশিত হবার পর থেকেই এটি কালজয়ী একটি বই হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

অর্থনীতিবিদ, তাত্ত্বিক রাজনীতিবিদ, নৈতিক ও রাজনৈতিক দার্শনিক, সমাজবিজ্ঞানী, এমনকি সাধারণ মানুষও তাঁর এই গবেষণালব্ধ ভয়াবহ ফলাফলের সাথে অবগত হল। নবজাগরণ প্রক্রিয়া তথা রেনেসাঁর মাধ্যমে সামাজিক যৌক্তিকতার যে ধারণা ২০০ বছর আগে বিকাশ লাভ করেছিল, অ্যারোর গবেষণায় তা ব্যর্থ প্রমাণিত হল।

এটা জানা গুরুত্বপূর্ণ যে, অ্যারো’র গবেষণার এই ফলাফল কীভাবে পাওয়া গেল। যে  যুক্তিতর্কের উপরে এই তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় তাতে দেখা যায়, শুধুমাত্র মানুষের মতের র‍্যাংকিং এর উপরে ভিত্তি করে  দুটি পৃথক সামাজিক নির্বাচন বিষয়ক সমস্যার সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হয়না। তাছাড়া প্রচলিত মতবাদের বাইরেও বেশকিছু জনপ্রিয় মতবাদ থাকে যেগুলোর মিলিত প্রতিক্রিয়ায় প্রাপ্ত তথ্যসমূহের ব্যবহার্যতা হ্রাস পায়।

সামাজিক সমৃদ্ধির বিচার করতে গেলে বিভিন্ন ব্যাক্তির স্বতন্ত্র লাভ ক্ষতি এবং নির্বাচনে তার প্রভাব সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। কারন সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যক্তিমতের র‍্যাংকিং হতে  এটা জানা কখনোই সম্ভব নয়।  এর সাথে সাথে এটা জানাও দরকারি যে বিভিন্ন ভোটিং প্রক্রিয়ায় কোন জনমত বা জনমতগুলো সমস্যার সৃষ্টি করছে।

সবকিছুর পরেও গণতন্ত্র কি আশা করে এবং ভোট গণনার (যদিও তা গুরুত্বপূর্ণ) বাইরেও কি কি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ , তা জানতে অ্যারোর অসম্ভাব্যতা তত্ত্ব গঠনমূলক ভূমিকা পালন করছে। গণতান্ত্রিক তথ্য ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধকরণ, অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সামাজিক উন্নয়নের যৌক্তিক নিরীক্ষার সুযোগ প্রদানের মাধ্যমে গণতন্ত্র আরো ভালোভাবে কাজ করতে পারবে। এইভাবে অনেকগুলো পৃথক প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের মাধ্যমে সামাজিক নির্বাচন তত্ত্ব একটি আনুষ্ঠানিক- বিস্তৃত বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

কোন পরিস্থিতিতে মেজরিটি রুল নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য ফলাফল প্রদান করবে? বিভিন্ন ভোটিং মাধ্যম একটি স্বচ্ছ ফল প্রকাশে কতটুকু সক্ষম ? সদস্যদের নানাবিধ স্বার্থ থাকা সত্ত্বেও একটি সমাজকে আমরা কতটুকু অগ্রসর বিবেচনা করতে পারি? কীভাবে একটি সমাজ দলগত সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেবার পাশাপাশি কোন ব্যক্তির অধিকার ও স্বাধীনতাকে সুযোগ দিতে পারে? সমাজের বিভিন্ন মানুষের সম্মিলিত দুর্গ্রহ এবং পরিবর্তনশীল প্রতিবন্ধকতার নিরিখে কীভাবে আমরা দারিদ্র্য পরিমাপ করতে পারি? কীভাবে জনমানুষের সম্পদ, যেমন প্রাকৃতিক পরিবেশকে আমরা সামাজিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারি?

একটি ন্যায়বিচার তত্ত্ব এই প্রশ্নগুলোর বাইরে গিয়েও সামাজিক নির্বাচন তত্ত্বকে বিশ্লেষণ এবং হিসাবিক ফলাফলের উপরে ভিত্তি করে এর উপরে নতুন আলোকপাত করতে পারে। ( যেমনটি ২০০৯ সালে আমি “দ্যা আইডিয়া অফ জাস্টিস” বইতে আলোচনা করেছি ) তাছাড়া এই বিষয়ে তাত্ত্বিকদের  গঠনমুলক আলোচনা আরো কিছু বিষয়ে গবেষণায় সহায়ক ভূমিকা রেখেছে যেগুলো সামাজিক নির্বাচন তত্ত্বের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। যেমনঃ লিঙ্গবৈষম্যের স্বরূপ ও ফলাফল, দুর্ভিক্ষের কারণ ও প্রতিকারের উপায়।

সামাজিক নির্বাচন তত্ত্বের প্রসার ও প্রয়োগ শুধুমাত্র যুক্তিতর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর ক্ষেত্র আরো বিস্তৃত।  অ্যারো’র অসম্ভাব্যতা তত্ত্ব এবং এর দ্বারা অনুপ্রাণিত আরো অনেক লেখা আমাদের যৌক্তিক চিন্তা করার এবং দলগত সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা বৃদ্ধি  করছে যার উপরে আমাদের জীবনধারণ ও আনন্দলাভ নির্ভর করে।    

 

 

মন্তব্য

জনপ্রিয় পোস্ট