উন্নয়নের লক্ষ্যে জ্ঞান



(কেভিন ওয়াটকিন্স ওভারসিজ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (ODI) এর পরিচালক। তিনি যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও মানবতাবাদী ইস্যু বিষয়ক  নেতৃস্থানীয়  চিন্তাবিদ)

লণ্ডন-  প্রায় ২৩৬ বছর আগে, আমেরিকার ভার্জিনিয়ার এক তরুণ গভর্নর শিক্ষা সংস্কারের অচলাবস্থা নিরসন করেন।  থমাস জেফারসন তাঁর ‘বিল ফর দ্য মোর জেনারেল ডিফিউশন অব নলেজ’ এ একটি সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থার কথা বলেন। ‘সবচেয়ে সম্পদশালী থেকে সবচেয়ে দরিদ্র’ -সকল নাগরিক এ শিক্ষাব্যবস্থার আওতাভূক্ত থাকবে। এটি ছিল আমেরিকার জনশিক্ষাব্যবস্থার প্রথম পদক্ষেপ।  এই প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপের  জন্যেই আমেরিকা দ্রুত বিশ্বব্যাপি প্রাধান্য অর্জন করেছে।

বিশ শতকের প্রথমভাগের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র জনশিক্ষায় বিশ্বের নেতৃত্বের স্থানে পৌঁছে গিয়েছিল। শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও সামাজিক গতিময়তা (সোশ্যাল মবিলিটি) র ক্ষেত্রে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। ক্লদিয়া গলডিন এবং লরেন্স কাট দেখিয়েছেন যে, শিক্ষা খাতে আমেরিকার এই  ব্যতিক্রমী উদ্যোগ দেশটিকে ইউরোপীয় দেশগুলোর তুলনায় একধাপ এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। কারণ ইউরোপ তখন  মানবসম্পদে তুলনামূলক কম বিনিয়োগ করছিল।   

এ সপ্তাহে ‘অসলো সামিট অন এডুকেশন ফর ডেভেলপমেন্ট’ এ বিশ্ব নেতৃবৃন্দ সমবেত হচ্ছেন। তাই আমেরিকার এই অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া শিক্ষা আমাদের জন্য এখন অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক । বস্তুত বিশ্বব্যাপি অর্থনীতি ক্রমে ক্রমে জ্ঞাননির্ভর হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে কোনো দেশের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে এর জনগণের শিক্ষা ও দক্ষতা  পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অন্তর্ভূক্তিমূলক শিক্ষাকাঠামো তৈরি করতে ব্যর্থ দেশগুলোতে মন্থরগতির উন্নয়ন, ক্রমবর্ধমান বৈষম্য ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে সুযোগ হারাতে দেখা যায়।

এমন অবস্থায়  শিক্ষা সংক্রান্ত অনেক আলোচনাই পুরনো মনে হয় । হার্ভার্ড এর অর্থনীতিবিদ রিকার্ডো হাউসম্যান মনে করেন ‘এডুকেশন, এডুকেশন, এডুকেশন ক্রাউড’ মূলত ‘প্রবৃদ্ধির জন্য কেবলই শিক্ষা’- নীতির ওকালতি করছে । তাই সম্প্রতি তিনি এ মতের তীব্র সমালোচনা করেন।  হাউসম্যানের সমালোচনাটি অসাধারণ ছিল । তবে আমার জানামতে এমন মত কেউ পোষণ করেন না ।

অবশ্যই শিক্ষা প্রবৃদ্ধির কোনো স্বয়ংক্রিয় উপায় নয়।  প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা, দুর্বল প্রশাসন ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার কারণে অনেক দেশে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়।  এ সব দেশে শিক্ষার প্রসার হলে মানুষ কম উৎপাদনশীল হয় ও  বেকারত্বের হার বেড়ে যায়।  উত্তর আফ্রিকায় , শিক্ষাব্যবস্থা ও চাকরির বাজারের অসামঞ্জস্যের কারণে শিক্ষিত তরুণরা সম্মানজনক সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এই বিষয়টি ‘আরব বসন্ত’ বিপ্লবগুলোতে ভূমিকা রেখেছে।

এ ঘটনাগুলোর কোনোটাই প্রকৃত শিক্ষা -যা কেবল কয়েক বছরের  প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, সত্যিকার জ্ঞানের মূল ভূমিকাকে খাটো করে না। প্রকৃত শিক্ষা প্রবৃদ্ধির অপরিহার্য উপাদান। অ্যাডাম স্মিথ থেকে রবার্ট সলো, গ্যারি বেকার এবং সম্প্রতি এরিক হানুসেক পর্যন্ত – এঁদের বিস্তৃত গবেষণা থেকে এটি নিশ্চিত যে, উৎপাদনক্ষম জনসম্পদ তৈরিতে শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।  ওইসিডি এর ‘ প্রোগ্রাম ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাসেসমেন্ট’ এ কোনো দেশের স্কোর স্ট্যান্ডার্ড ডেভিয়েশন এর একধাপ উপরে গেলে সেদেশের দেশের দীর্ঘমেয়াদে ২ শতাংশ মাথাপিছু প্রবৃদ্ধি হয়।   

শিক্ষা হয়তো ধীরগতির প্রবৃদ্ধির জন্য কোনো দ্রুত সমাধান নয়। তবে  এমন কোনো দেশের নাম চিন্তা করাও মুশকিল যেটি শিক্ষায় অগ্রগতি ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক উন্নতি করেছে।

বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদেরা শিক্ষাবিতর্কে কিছু দূর্বল যুক্তি উপস্থাপন করেছে। শিক্ষা একটি জনস্বার্থসম্পর্কিত বিষয় যার অর্থসংস্থানের এবং একে জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের - এই অভিমতের সমালোচনা করেন বিশ্বব্যাংকের  শান্তা দেবারজন । তিনি এতে দ্বি-মত পোষণ করে বলেন যে, শিক্ষাকে একটি ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে বিবেচনা হওয়া উচিত। এটি বাজারের মাধ্যমে এর গ্রাহকের কাছে পৌঁছবে। তিনি মনে করেন শিক্ষা পিতা-মাতা ও সন্তানের ব্যক্তিগত লাভালাভের সঙ্গে জড়িত।

সমস্যা হলো , শিক্ষা সরাসরি জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নয়। অবশ্য বাস্তবে খুব কম বিষয়ই সরাসরি জনস্বার্থের সঙ্গে জড়িত।  শিক্ষা একটি মননধর্মী বিষয় যা সরকারের বিনামূল্যে প্রদান করা উচিত। কেননা পিতামাতা যদি সন্তানের শিক্ষায় কম বিনিয়োগ করে বা দরিদ্রতার জন্য কেউ বাদ পড়ে যায় , তাহলে দেশ বিশাল অঙ্কের ব্যক্তিক ও সামাজিক বিকাশ থেকে বঞ্চিত হবে। উদাহরণ হিসেবে , শিক্ষার, বিশেষ করে নারীশিক্ষার অগ্রগতির সঙ্গে শিশুর টিকে থাকা ও পুষ্টি/ শিশুস্বাস্থ্য ও পুষ্টি , মাতৃস্বাস্থ্য  এবং মেয়েদের উচ্চতর বেতন ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।

সময় এসেছে খোঁড়া যুক্তির ওপর দাঁড়ানো নিস্ফল আলোচনা থেকে সরে এসে শিক্ষার প্রকৃত চ্যালেঞ্জের দিকে মনোযোগ দেয়ার। যদি আমরা টেকসই  উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য উন্নতমানের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা অর্জন করতে চাই, তাহলে এই চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড়াতেই হবে। অসলো শীর্ষসম্মেলন এই লক্ষ্য অর্জনের ভিত্তিনকশা স্থাপনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ  করে দিয়েছে। যেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়পড়ুয়া বয়সী শিশুর সংখ্যা ৫৯ মিলিয়ন এবং বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া কিশোর-কিশেরীর সংখ্যা  ৬৫ মিলিয়ন সেখানে এ সুযোগ দুহাতে লুফে নেয়া উচিত।

 সম্মেলনটি সার্থক হবে যদি তাঁরা চারটি বিষয়কে অবশ্য কর্তব্য বলে বিবেচনা করে । প্রথমত, সরকারকে শিক্ষাখাতে আরো বেশি দেশিয় তহবিল বরাদ্দ করতে হবে।  সম্মেলনের একটি নেপথ্য প্রবন্ধে শিক্ষাখাতে বিনিয়োগের ইস্যুতে পাকিস্তানের সরকারগুলোর ক্রমাগত ব্যর্থতার দিকে আলোকপাত করা হয়েছে। এ কারণে বর্তমানে পাকিস্তান সবচেয়ে বেশি বিদ্যালয়-বহির্ভূত জনসংখ্যা রয়েছে এমন দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় । সমস্যার মূলে রয়েছেন রাজনীতিবিদগণ। এরা দরিদ্রদের শিক্ষার সুযোগ করে দেওয়ার চেয়ে সম্পদশালীদের ট্যাক্স ফাঁকির সুযোগ করে দিতে বেশি উৎসাহী।

দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠীরা শিক্ষার জন্যে দিন দিন কম সাহায্য দিচ্ছেন। এই প্রবণতা পরিবর্তন করতে হবে। বিশ্বব্যাপি নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষা অর্জনের জন্য আরও প্রায় ২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন। যা বর্তমানে যে পরিমাণ অর্থ দেওয়া হয় তার প্রায় পাঁচগুণ। সাহায্যের এই বিশাল ব্যবধান মেটাতে হবে।  এর সাথে জাতিসংঘের শিক্ষা বিষয়ক বিশেষ দূত গর্ডন ব্রাউন যুদ্ধাক্রান্ত ও মানবেতর, জরুরি অবস্থার সম্মুখীন শিশুদের কাছে শিক্ষা পৌঁছে দেয়ার জন্য অর্থসংস্থানের কার্যকর পদক্ষেপ আহ্বান করেছেন।

তৃতীয়ত, অসমতার ব্যাপারে বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে সচেতন হতে হবে। প্রত্যেক সরকারকে নারী-পুরুষ, সম্পদ ও গ্রামীণ-শহুরে ভেদে বৈষম্য কমিয়ে আনার জন্য সুস্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।  সেই লক্ষ্যের সাথে সংগতিপূর্ণ বাজেট প্রণয়ন করতে হবে ।  পৃথিবীতে এখনো বৈষম্যগুলো বেশ প্রকট। উদাহরণ হিসেবে, নাইজেরিয়ায়, শহুরে  বিত্তবান ২০ শতাংশ পরিবারের ছেলেরা গড়ে প্রায় দশ বছরের শিক্ষা লাভ করে , অন্যদিকে উত্তর অঞ্চলের দরিদ্র গ্রামীণ মেয়েরা দুবছরেরও কম সময় বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করতে পারে। এছাড়া, অসলো সম্মেলনের আরেকটি নেপথ্য প্রবন্ধে দেখানো হয়েছে, বেশিরভাগ রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যয় পক্ষপাতিত্বমূলকভাবে বিত্তবানদের  অনুকূলে।

সবশেষে, সরকার ও দাতা সংস্থাদের অবশ্যই বাজারভিত্তিক পরীক্ষণ বাদ দিয়ে পুরো ব্যবস্থার প্রকৃত পুনর্গঠন করার অঙ্গীকার করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রধান অগ্রাধিকার পাবেন শিক্ষকরা । তারা যেন যথাযথ পারিতোষিক পান সেদিকে নজর রাখা প্রয়োজন। যথাযথ শিক্ষা প্রদানের জন্য শিক্ষকদের কার্যকর প্রশিক্ষণ ও নির্ভরযোগ্য সহায়ক ব্যবস্থা রাখা জরুরি। কেননা কোনোদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ততটুকুই ভালো থাকে যতটুকু ভালো থাকেন শিক্ষকেরা।  

অসলোতে যখন বিশ্বের নেতৃবৃন্দ সমবেত হয়েছেন তখন লক্ষ লক্ষ অভিভাবক তাদের সন্তানের প্রাপ্য শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য সংগ্রাম করছেন।  সেই শিক্ষা তাদের নিজের ও পরিারের একটু উন্নততর জীবনযাপনে সক্ষম করবে। এই অভিভাবকদের কাছে বিদ্যালয় একটি আশার উৎস। আমরা তাদের এবং তাদের সন্তানদের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে দায়বদ্ধ।

মন্তব্য

জনপ্রিয় পোস্ট