নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা- সমস্যাগুলো কি?



এই লেখাটি লিখেছেনঃ রাষ্ট্রদূত ক্যাথি রাসেল, বিশ্বজুড়ে নারীদের সমস্যা বিষয়ক মার্কিন রাষ্ট্রদূত।


নারীরাই প্রথমে লক্ষ্য করেছিলেন যে তাদের এলাকায় সন্দেহজনক কিছু ঘটছে। দক্ষিণ আফগানিস্তানে তাদের সম্প্রদায়ের ভিতরে অদ্ভুত সব কার্যকলাপ সংগঠিত হচ্ছিল। উজবেক মহিলারা সেই এলাকায় বিদেশী বিনিয়োগ আনার নাম করে প্রত্যেক বাড়িতে কড়া নেড়ে তাদের পরিবার এবং পুরুষ সন্তানদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করছিলেন। কিন্তু স্থানীয় মহিলারা ভাবলেন তাদের এলাকার মতো আফগানিস্তানের প্রত্যন্ত দুর্গম এলাকায় বিদেশী বিনিয়োগ মোটেও স্বাভাবিক নয়। তারা ঘটনাটি ভালোভাবে অনুসন্ধান করে জানতে পারলেন যে তাদের এলাকার ছেলেদের সাথে এমন একটি ঘটনা ঘটছে যা মোটেও কাম্য নয়। তারা জঙ্গি বাহিনীগুলোতে ভর্তির জন্য লক্ষ্যে পরিণত হচ্ছে।

সেইসব মহিলাদের মধ্যে ১২ জন কাবুলে গেলেন ঘটনাটি সম্পর্কে সবাইকে সতর্ক করতেতারা সরকারের একজন মন্ত্রীর কাছে গেলেন এবং সবকিছু খুলে বললেন। কিন্তু যথেষ্ট গুরুত্ব দেবার বদলে মন্ত্রী সেইসব মহিলাদের কথাকে উপহাস করলেন এবং  তাদেরকে হতাশ ও শূন্য হাতে বাসায় পাঠিয়ে দিলেন। এর এক মাসের মাঝেই জঙ্গিরা তাদের এলাকায় একটি বাসে আক্রমণ চালালো এবং ডজনখানেক মানুষ নিহত হল।  

বৈশ্বিক শান্তি এবং সুরক্ষা প্রচেষ্টায় নারীদের অন্তর্ভুক্তিকরণ সিদ্ধান্তের ১৫ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে সম্প্রতি ওয়াশিংটন ডিসি তে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে আফগান কর্মী ওয়াযমা ফ্রঘ এই সত্য কাহিনীটি বর্ণনা করেন । এই বিষয়টি নিয়ে পুর্বে অসংখ্য অনুষ্ঠানে আলোচনা হলেও, গল্পটি ছিল অনুষ্ঠানের মূল আলোচ্য বিষয় থেকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি থাকা সত্তেও এবং সংঘাতের মুহূর্তে কোন একটি এলাকায় শৃঙ্খলা রক্ষা প্রচেষ্টায় নারীদের মুখ্য ভূমিকা থাকার পরেও, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যখন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়,  আলোচনার টেবিলে নারীরা কদাচিৎ উপস্থিত থাকেন।

নিউইয়র্কে একইরকম একটি বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে কঙ্গোলিজ নারী ফান্ডের প্রেসিডেন্ট জুলিয়েন লুসেঞ্জ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সামনে বক্তৃতা দেন। সেখানে তিনি বলেন, “আমি অনেকবার ভেবেছি আমি কি সত্যি এখানে এসে সেই একই নৃশংসতার বর্ণনা দিতে চাই? আমি কি বলতে চাই যে, কঙ্গোতে নারীদের অবস্থার প্রায় কিছুই পরিবর্তিত হয়নি। তিনি আরও বলেন, আপনারা নিপীড়িত নারীদের মর্মন্তুদ আর্তনাদ আগেও অনেকবার শুনেছেন। কিন্তু আপনাদের নেয়া কোন পদক্ষেপ সেই অবস্থার পরিবর্তন আনতে আনতে পারেনি। আজকে কঙ্গোর নারীদের কান্নার শব্দকে আপনারা উপেক্ষা করবেন না”

লুসেঞ্জ বর্ণনা করেন কিভাবে কঙ্গোতে নারীরা শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে আগ্রহী ছিল, কিন্তু কেউই আলোচনায় তাদের অংশগ্রহণ করতে দেয়নিসেখানে কেবল দুটি দলই আছে যারা সংঘাতে লিপ্ত। হয় আপনি সরকারের পক্ষে, নতুবা এম২৩ ( বিদ্রোহী দল) এর পক্ষে”- নারীদের দাবীর প্রতিউত্তরে কি জবাব পেয়েছেন তা বলতে গিয়ে লুসেঞ্জ বলেন

নারীদের আলোচনা থেকে বর্জনের বিপরীতে আমরা প্রচুর প্রমাণ দেখতে পাই যেখানে নারীদের অংশগ্রহণে শান্তি আলোচনা আরো সাফল্য অর্জন করেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গবেষকেরা স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী শান্তিকরণ প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে দেখেছেন যেসব ক্ষেত্রে নারীরা অংশ নিয়েছেন বা ভূমিকা রেখেছেন সেখানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আলোচনা একটি শান্তিপূর্ণ মতৈক্যে উপনীত হয়েছে। একটি বিশ্বব্যাপী অনুসন্ধানে দেখা যায়, যখনি কোন আলোচনা থমকে গেছে অথবা সংলাপে কোন সিদ্ধান্ত আসেনি, নারীর ভূমিকা সেসব ক্ষেত্রে নতুন করে আলোচনাকে এগিয়ে নিতে অথবা কার্যকরী সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছে। 

শান্তির পথে নারীরা যে গুরুত্বপূর্ণ একটি পাথেয় তার এতো প্রমাণ থাকা সত্তেও কেন বারবার আলোচনার টেবিলে তাদের উপেক্ষা করা হচ্ছে?

একটা সমস্যার কথা আমি প্রায়ই শুনি, সেটা হল “আগে-তবে” পূর্বশর্ত। কেউ বলতে চায় না যে নারীরা আলোচনায় অংশ নিতে পারবে না, কিন্তু তারা এর সাথে দ্রুতই শর্ত জুড়ে দেয়, “আগে” জঙ্গিদের একসাথে আসতে হবে অথবা জটিল নিরাপত্তা সমস্যাগুলোর “আগে” সমাধান করতে হবে। যদি এটা করা যায় “তবে” নারীরা সংলাপে অংশ নিতে পারবে।

এই পদ্ধতিটি যোদ্ধাদের উপরেই অধিক নির্ভরশীল। নারীরা স্থানীয় পর্যায়ের অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তা সমস্যাগুলো সবচেয়ে ভাল জানেন এবং তারা এটা বেশ ভালো করে বুঝতে পারেন যে প্রাথমিক কিকি কারণে একটি সহিংসতা বা সংঘাত শুরু হয়েছে। যদি শান্তি প্রক্রিয়া থেকে তাদের সরিয়ে দেয়া হয় তাদের এই মূল্যবান জ্ঞান থেকে আমরা বঞ্চিত হবশুধু তাই নয়, এতে করে রাজনীতি, ন্যায় বিচার এবং নিরাপত্তা বিষয়ক স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভিত্তি দুর্বল হয়ে যাবে, কেননা এই প্রতিষ্ঠানগুলো তখনই সবচেয়ে ভালো কাজ করে যখন এতে ওই অঞ্চলের সব ধরণের মানুষের কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হয়।

নারীদের যদি আলোচনার টেবিলে অংশ নেবার সুযোগ দেয়া হয়, তবে শান্তি প্রক্রিয়ায় অংশ নেবার জন্য তাদের প্রস্তুত করতে হবে, বিশেষ করে তাদের অংশগ্রহণ যদি অন্য কোন দল বা অংশগ্রহণকারী দ্বারা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় স্থানীয় পুলিশ বাহিনীতে অথবা রাজনৈতিক দলের সাথে কাজ করার মাধ্যমে নারীরা ভবিষ্যতের জন্য প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে। এই ধারণাটি প্রত্যেক সমাজ ও এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে কাজ করবেনেতাদের উচিত সরকারে নারীদের নিয়োগ নিশ্চিত করা, বেসামরিক প্রশাসনে তাদের কাজের সুযোগ করে দেয়া অথবা নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নিয়োগ দেয়া। এতে করে শান্তি আনয়নে নেতৃত্ব দিতে কিংবা সংঘাত প্রতিরোধে মাঠপর্যায়ে ভূমিকা রাখতে তারা আরও বেশি সক্ষম হবে।

কিন্তু পরিশেষে এই উদ্যোগগুলো একটা তিক্ত সত্যকেই সামনে তুলে আনে, তা হল স্থানীয়, জাতীয় অথবা আন্তর্জাতিক পর্যায় সবক্ষেত্রেই রীতিনীতি পুরুষদের অধিক সুবিধা দেয়সহিংসতামুক্ত জীবন যাপন করা, শিক্ষা অর্জন করা, ভালোভাবে বেঁচে থাকা, নেতৃত্ব দিয়ে সমাজের সেবা করা- এসব ক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতা সীমিত।  এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় সরকারী কর্মচারী, পুলিশ, সৈনিক, আইন আদালত এবং সমাজের প্রত্যেকেই তাদের কণ্ঠকে অবহেলা করতে সাহস পায়।

বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় নারী ও মেয়ে শিশুদের সমাজের সব ক্ষেত্রেই সক্ষম করে তুলতে হবেএকারণেই গত সপ্তাহে, জাতিসঙ্ঘে আমেরিকার দূত সামান্থা পাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন, বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় নারীদের সমান ভূমিকা নিশ্চিতকরণে  যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে যার আর্থিক মূল্য ৩১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

কিন্তু এটা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, নিরাপত্তা ব্যবস্থার মতো বিষয়ে নারীর ভূমিকা নিরূপণে সরকারের উদ্যোগ কিংবা সম্পদই শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমাদের মানুষের মানসিক অবস্থারও পরিবর্তন ঘটাতে হবে। বিশ্বে, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও অনেক রাজনৈতিক, সামরিক এবং নিরাপত্তা বিষয়ক নেতা লিঙ্গ বৈষম্যকে একটি মৃদু সমস্যা হিসেবে দেখেন যার সমাধান পরেও করা যাবে।

সমস্তকিছুর প্রমাণ আমাদের সামনে আছে। এগুলোকে গ্রাহ্য না করার ঝুঁকি কিন্তু আমাদেরকেই নিতে হবে।  

 

For original article, please cllick : http://blogs.cfr.org/women-around-the-world/2015/10/26/whats-the-problem-with-women-peace-and-security/

 

 


মন্তব্য

জনপ্রিয় পোস্ট